মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ১৮ দিন পর রাজবাড়ী সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষের সার্বিক প্রচেষ্টায় পরিবারের কাছে ফিরলেন নীলফামারীর মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধা মোছাঃ জোবেদা খাতুন। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ফরিদপুর সিআইডির বিশেষ টিমের সহায়তায় তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে গত শনিবার (৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে তার ছেলে শাহিনুর রহমানের কাছে তাকে হস্তান্তর করে সদর থানা পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জোবেদা খাতুন নীলফামারী সদর উপজেলার ওয়ারেছিপাড়া এলাকার জিয়ার উদ্দিন রহমানের মেয়ে। প্রায় ১৭-১৮ দিন আগে তিনি নীলফামারী সদরের নিজ বাসা থেকে নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার পর কীভাবে তিনি রাজবাড়ীতে এসে পৌঁছান, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ৬ জুলাই সন্ধ্যার আগে রাজবাড়ী শহরের পৌরসভার সামনে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সড়কে পড়ে যান জোবেদা খাতুন। এতে তার ঠোঁট কেটে যায়। পরে ইজিবাইক চালক, যাত্রী ও পুলিশের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তার ঠোঁটে সেলাই দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে তাকে হাসপাতালের দোতলার মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে ভর্তির পরও তার কাছ থেকে কোনো পরিচয় জানা সম্ভব হচ্ছিল না। কথা বলতে না পারায় এবং স্ট্রোকজনিত কারণে শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়ায় তিনি নিজের নাম-ঠিকানাও বলতে পারছিলেন না। বিষয়টি জানতে পেরে তার পরিচয় ও পরিবারের সন্ধানে উদ্যোগ নেন রাজবাড়ী সদর থানার ওসি উত্তম কুমার ঘোষ।
একপর্যায়ে রাজবাড়ীর পুলিশ সুপারের নির্দেশে ফরিদপুর থেকে সিআইডির একটি বিশেষ টিম রাজবাড়ীতে আসে। টিমের সদস্যরা বৃদ্ধার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেন। সেই ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য শনাক্ত করা হয়। পরে এনআইডির সঙ্গে নিবন্ধিত বিভিন্ন মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে তার পরিবারের সদস্যদের সন্ধান পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে নীলফামারীতে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে এসে জোবেদা খাতুনকে শনাক্ত করেন। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে শনিবার রাতে রাজবাড়ী সদর থানার ওসি উত্তম কুমার ঘোষের উপস্থিতিতে তাকে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জোবেদার ছেলে শাহিনুর রহমান বলেন, “প্রায় ১৭-১৮ দিন আগে আমার আম্মা নীলফামারী সদরের বাসা থেকে বের হয়ে যান। স্ট্রোক করার পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। বাসা থেকে বের হওয়ার পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমরা স্থানীয় থানায় জিডি করেছিলাম। পরে রাজবাড়ী সদর থানার ওসি স্যার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানতে পারি, আমার আম্মা রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। রাজবাড়ীতে এসে আমি আমার মাকে ফিরে পেয়েছি। তাকে খুঁজে পেতে সহযোগিতা করায় রাজবাড়ী সদর থানার ওসিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”
ইজিবাইক চালক মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, গত ৬ জুলাই সন্ধ্যার আগে তিনি রাজবাড়ী পৌরসভার সামনে দিয়ে ইজিবাইক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় বৃদ্ধা হঠাৎ ইজিবাইকের সামনে এসে ধাক্কা খেয়ে সড়কে পড়ে যান। পরে তিনি সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায় বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাসপাতালে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসার খরচও তিনি বহন করেন বলে জানান।
রাজবাড়ী সদর থানার ওসি উত্তম কুমার ঘোষ বলেন, “গত ৬ জুলাই পৌরসভার সামনে এক বৃদ্ধা ইজিবাইকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার খবর পাই। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের মোবাইল টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। পরে মোবাইল টিমের সদস্য ও দুর্ঘটনায় জড়িত ইজিবাইক চালক বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “বৃদ্ধার পরিচয় শনাক্ত করতে পুলিশ সুপার স্যারের নির্দেশক্রমে ফরিদপুর সিআইডিকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে সিআইডির বিশেষ টিম এসে তার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে এনআইডির তথ্য শনাক্ত হওয়ার পর সেই এনআইডির বিপরীতে নিবন্ধিত বিভিন্ন সিমের নম্বর সংগ্রহ করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা রাজবাড়ীতে এসে বৃদ্ধাকে শনাক্ত করেন।”
ওসি উত্তম কুমার ঘোষ জানান, জোবেদা খাতুনের এক ছেলে নীলফামারী পুলিশ লাইনে সিভিল স্টাফ হিসেবে কর্মরত এবং আরেক ছেলে সাভারের নবীনগরে থাকেন। পরিবারের সদস্যরা রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে এসে তাকে শনাক্ত করার পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তার ছেলে ও নাতির কাছে বৃদ্ধাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নিখোঁজ হওয়ার পর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অপরিচিত অবস্থায় রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা বৃদ্ধা জোবেদা খাতুনকে আধুনিক প্রযুক্তি ও পুলিশের উদ্যোগে শনাক্ত করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।