মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
বর্ষা মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় সাপে কাটার ঘটনা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তবে সাপে কাটলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ এন্টিভেনম বা বিষ প্রতিষেধক মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইসরাত জাহান উম্মন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই মাসে কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপে কাটা ১৩ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। চলতি আগস্ট মাসেও এ পর্যন্ত ২ জন সাপে কাটা রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা নিয়ে প্রত্যেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইসরাত জাহান উম্মন বলেন, “সাপে কাটলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে এলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। আমাদের হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত এন্টিভেনম মজুদ রয়েছে।”
তিনি বলেন, সাপে কাটার পর ওঝা, বৈদ্য বা প্রচলিত ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। দ্রুত রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনাতেও সাপে কাটার পর দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়াকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষক্রিয়া হলে উপযুক্ত এন্টিভেনমই জীবন রক্ষাকারী প্রধান চিকিৎসা।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, সাপে কাটার পর রোগীকে শান্ত রাখতে হবে এবং আক্রান্ত অঙ্গ যতটা সম্ভব স্থির রাখতে হবে। রোগীকে হাঁটিয়ে বা দৌড় করিয়ে হাসপাতালে নেওয়া উচিত নয়। সম্ভব হলে আক্রান্ত অঙ্গ নড়াচড়া না করিয়ে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে। WHO-এর নির্দেশনায় সাপে কাটার স্থানে কাটা-ছেঁড়া করা, বিষ চুষে বের করার চেষ্টা, শক্ত করে দড়ি বা টুর্নিকেট বাঁধা এবং বিভিন্ন ভেষজ বা লোকজ চিকিৎসা প্রয়োগ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব পদ্ধতি ক্ষতিকর হতে পারে এবং হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি করতে পারে।
ডা. ইসরাত জাহান উম্মন আরও বলেন, সাপে কাটার পর আক্রান্ত স্থানে কোনোভাবেই ব্লেড বা ছুরি দিয়ে কেটে দেওয়া যাবে না। রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। বমি হলে শ্বাসনালিতে বমি ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে রোগীকে কাত করে রাখার পরামর্শও রয়েছে।
তিনি বিশেষ করে কৃষকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা নিয়মিত মাঠে কাজ করেন, বিশেষ করে পাট, ধান ও ঘাসের ক্ষেতে, তাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। মাঠে কাজের সময় সম্ভব হলে গামবুট ও হাতে গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। ঘাস বা ঝোপঝাড়ে প্রবেশের আগে লাঠি দিয়ে নেড়ে দেখে নেওয়া যেতে পারে। এতে সেখানে সাপ থাকলে সরে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কৃষিশ্রমিকসহ গ্রামীণ এলাকার মানুষ সাপের কামড়ের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং এর মধ্যে প্রায় ১৮ থেকে ২৭ লাখ মানুষের শরীরে বিষক্রিয়া (envenoming) দেখা দেয়। সাপের বিষে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, রক্তক্ষরণজনিত জটিলতা, কিডনি বিকল হওয়া এবং আক্রান্ত অঙ্গে গুরুতর টিস্যু ক্ষতির মতো জীবনহানিকর সমস্যা হতে পারে।
তবে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছে উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করলে সাপের কামড়ে মৃত্যুঝুঁকি ও গুরুতর জটিলতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। WHO বলছে, উপযুক্ত এন্টিভেনম দ্রুত প্রয়োগ করা হলে বিষের অধিকাংশ ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিরোধ বা কমানো সম্ভব।
কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে তাই সাপে কাটা রোগী ও স্বজনদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে—আতঙ্ক নয়, দ্রুত চিকিৎসা; ওঝা-বৈদ্য নয়, হাসপাতালে আসুন। সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানোই সাপে কাটা রোগীর জীবন রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।