আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মিয়ানমারে বসবাসের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন কর্মসূচির প্রথম ধাপ চূড়ান্ত করেছে মালয়েশিয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে।
বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ এ প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের দুটি নৌযুদ্ধজাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ৪ হাজারের বেশি মানুষকে শরণার্থী নিবন্ধন নথি (ডিপিপি) কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে করা সমঝোতা অনুযায়ী মোট ৫ হাজার মানুষকে পর্যায়ক্রমে স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের আওতায় আনার কথা রয়েছে।
যাচাই-বাছাইয়ে মালয়েশিয়া
মালয়েশিয়ার অভিবাসন আটককেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে মিয়ানমারের হাজারো নাগরিক রয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে ১০ হাজার ৩৮৮ জন মিয়ানমারের নাগরিক আটক ছিলেন। তবে আটক থাকা প্রত্যেক ব্যক্তিকে শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
আটক ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব, পরিচয়, অভিবাসন পরিস্থিতি, আশ্রয়ের আবেদন এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করতে অভিবাসন বিভাগ পুলিশের সহযোগিতায় কাজ করছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
মালয়েশিয়া সরকার এর আগে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, প্রত্যাবাসনের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্যাতন বা জীবননাশের আশঙ্কা থাকলে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে না। দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিলও বলেছেন, মানবিক ঝুঁকি তৈরি হলে মালয়েশিয়া দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রত্যাবাসন নিয়ে মানবাধিকার উদ্বেগ
তবে মালয়েশিয়ার এই উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, মিয়ানমারে এখনো রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও প্রকৃত অর্থে স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
সংস্থাটি বলেছে, দেশটির সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হলে তাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি এবং শরণার্থীদের আনুষ্ঠানিক মর্যাদাও স্বীকৃতি দেয় না। তবুও দেশটিতে বড় একটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছে।
এ অবস্থায় আগামী ২৯ সেপ্টেম্বরের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে সেটি মালয়েশিয়া থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। তবে প্রত্যাবাসনের আগে নিরাপত্তা, স্বেচ্ছাসম্মতি এবং মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর তাদের জীবন ও মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে কি না—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।