নজরুলের বিদেশি সম্পদের খোঁজ, জার্সির ব্যাংকে ৫৩ লাখ পাউন্ড জব্দের নির্দেশ

নজরুলের বিদেশি সম্পদের খোঁজ, জার্সির ব্যাংকে ৫৩ লাখ পাউন্ড জব্দের নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, তার স্ত্রী ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্য, আইল অব ম্যান, জার্সি ও হংকংসহ বিভিন্ন স্থানে অর্থ স্থানান্তর ও সম্পদ গড়ে তোলার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এরই মধ্যে জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রী নাসরিন ইসলামের প্রকৃত মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে থাকা ৫৩ লাখ পাউন্ড জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবির দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, জার্সির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ‘ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’-এর ব্যাংক হিসাব এবং প্রতিষ্ঠানটির নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, নজরুল ইসলাম মজুমদার, তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীরা বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে দেশের ২৬টি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অর্থের একটি অংশ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

জার্সির হিসাবে ৫৩ লাখ পাউন্ড

দুদকের অনুসন্ধানে নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিদেশি সম্পদের বিষয়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড অন্যতম। আইল অব ম্যানের ঠিকানায় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালের ১৭ মে প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছরের ২ অক্টোবর জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির নামে একটি হিসাব খোলা হয়।

গত ৬ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, ওই ব্যাংক হিসাবে ৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় ৫৩ লাখ পাউন্ড জমা ছিল। দুদকের অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিকানা নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রী নাসরিন ইসলামের বলে উঠে এসেছে।

এই অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা সম্পদ হস্তান্তরের আশঙ্কা থেকে তা সুরক্ষিত রাখতে আদালতের শরণাপন্ন হয় দুদক। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট হিসাব ও সম্পদ অবরুদ্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

২৬ ব্যাংকে ঋণের বিস্তৃত অনুসন্ধান

দুদকের অনুসন্ধানে নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কোনো ক্ষেত্রে গ্রুপের মূল প্রতিষ্ঠানের নামে, আবার কোথাও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উঠে এসেছে।

কিছু ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিলে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখছে দুদক। এক ব্যাংকের অর্থ দিয়ে অন্য ব্যাংকের দায় মেটানোর মতো ব্যবস্থাও ছিল কি না, সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।

এর আগে নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে একটি ব্যাংক থেকে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৯৯৮ কোটি টাকা বিশেষ বিবেচনায় দেওয়ার অভিযোগও ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনেও এসব ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তে তৈরি পোশাক ও সুতা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নাসা গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ঋণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি—দুই ধরনের ব্যাংক থেকেই ঋণ নেওয়ার তথ্য রয়েছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। সব মিলিয়ে সর্বশেষ অনুসন্ধানে ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিদেশে অর্থ সরানোর অভিযোগ

দুদকের অনুসন্ধানে দেশের বাইরে অর্থ স্থানান্তরের বিভিন্ন মাধ্যমও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যবহার করে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমদানি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ বিদেশে পাঠানো, রপ্তানি পণ্যের মূল্য দেশে না এনে বিদেশে রেখে দেওয়া কিংবা পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে অবশিষ্ট অর্থ অন্য পথে সরিয়ে নেওয়ার মতো কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, হংকং, আইল অব ম্যান ও জার্সিতে নজরুল ইসলাম মজুমদারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য পেয়েছে দুদক। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সম্পদ কেনার সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

ব্যাংক খাতে প্রভাবের অভিযোগ

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নজরুল ইসলাম মজুমদার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন—এমন দাবি রয়েছে বিভিন্ন মহলে। তিনি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও ছিলেন।

ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের নেতৃত্বে থাকার কারণে ব্যাংক খাতে তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ব্যবহার করে বিভিন্ন কর্মসূচি ও তহবিলের জন্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহে চাপ প্রয়োগের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংক খাতে নজরুল ইসলাম মজুমদারের প্রভাব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণের বিষয়গুলো বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। দুদকের অনুসন্ধান ও আদালতের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top