নিজস্ব প্রতিনিধি:
রাজধানীর খিলক্ষেতে মুক্তা ইসলাম মাওয়া (২৫) নামে এক তরুণীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তার স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে মরদেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এ ঘটনায় করা মামলায় প্রধান অভিযুক্ত স্বামী সোহেল শিকদারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ এবং যৌতুকের দাবিতে কয়েক মাস ধরে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন সোহেল। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট তাকে বেল্ট দিয়ে মারধরের একটি ভিডিওও ধারণ করেন তিনি। পরে ওই ভিডিও মুক্তার এক স্বজনের কাছে পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান সোহেল।
ভিডিওটির প্রায় তিন মিনিটের ফুটেজে মুক্তাকে খাটের সঙ্গে আটকে রেখে মারধর করার দৃশ্য দেখা যায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তার পায়ে শিকল পরানো ছিল এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এ সময় সোহেলকে তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে এবং মারধরের হুমকি দিতে শোনা যায়।
ভিডিওতে মুক্তাকে নিজের কোনো অপরাধ নেই দাবি করে স্বামীর প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে শোনা যায়। একপর্যায়ে তিনি আর মারধর না করার অনুরোধ করেন। কিন্তু পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপরও তাকে বেল্ট দিয়ে আঘাত করা হয়।
নির্যাতনের সময় মুক্তার দুই সন্তান সাফওয়ান (৫) ও তাসফিয়া (৪) পাশের কক্ষে ছিলেন। সন্তানদের কান্নার কথা উল্লেখ করে তাদের ঘুম পাড়িয়ে আসার সুযোগ চেয়েছিলেন মুক্তা। পরিবারের অভিযোগ, সেই অনুরোধেও সোহেলের নির্যাতন থামেনি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের একটি ভবনের তৃতীয় তলার বাসা থেকে মুক্তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্বজনরা সেখানে গিয়ে তাকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই মরদেহটি নামানো হয়েছিল বলে দাবি করেছেন মুক্তার ভাই তানভীর রহমান।
এ ঘটনায় গত শুক্রবার খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন তানভীর। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহে সোহেল তার স্ত্রীকে নিয়মিত নির্যাতন করতেন। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট বেল্ট দিয়ে মারধর করে তাকে গুরুতরভাবে আহত করা হয়। ওই নির্যাতনের ভিডিও এক স্বজনের কাছে পাঠানোর পাশাপাশি মুক্তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তানভীর রহমানের দাবি, কয়েক মাস আগে সোহেল তার কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। সেই টাকা দিতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করেও তার বোনের ওপর নির্যাতন চালানো হতো।
তিনি বলেন, মুক্তা মারা যাওয়ার পর তার দুই সন্তান সারাক্ষণ কান্না করছে। তারা বাবার বিরুদ্ধে মাকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ করছে। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন তিনি।
তানভীর আরও জানান, তারা চার ভাই-বোন এবং ছোটবেলায় তাদের বাবা মারা যান। তাদের মা অনেক কষ্ট করে সন্তানদের বড় করেছেন। পরিবারের কথা চিন্তা করে মুক্তা নিজের ওপর চলা নির্যাতনের অনেক বিষয় গোপন রাখতেন বলেও জানান তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হওয়ার পর খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করছিলেন তিনি।
সোহেল প্রথমে খিলক্ষেত এলাকায় মুদি দোকান চালাতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসায় যুক্ত হন। ব্যবসায় সফলতা না আসার পর স্ত্রীর সঙ্গে তার বিরোধ বাড়তে থাকে বলে পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য। একপর্যায়ে শ্বশুরবাড়ির কাছে যৌতুক দাবি করা শুরু হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
খিলক্ষেত থানার ওসি মুহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন জানিয়েছেন, মুক্তাকে মারধরের যে ভিডিও পুলিশের হাতে এসেছে, সেটি তার মৃত্যুর তিন দিন আগের। মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। মামলার প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগে হাজারো কল
এদিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে গত কয়েক বছর ধরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কল এসেছে।
২০২৫ সালে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে ১৮ হাজার ৬২৬টি কল আসে। ২০২৪ সালে এ ধরনের অভিযোগে কলের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৩৩টি, যার মধ্যে ১১ হাজার ৪১৮টি ছিল স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ।
২০২৩ সালে মোট ২৬ হাজার ৭৯৮টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৯ হাজার ৯১৩টি। ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭১২টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫৬০টি।
এর আগের বছর, ২০২১ সালে স্ত্রী নির্যাতনসংক্রান্ত ১২ হাজার ১৬৯টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৩ হাজার ৩৪৮টি।
মুক্তার মৃত্যুর ঘটনায় এখন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও তদন্তের পরবর্তী ধাপের দিকে তাকিয়ে রয়েছে পরিবার। পুলিশের তদন্তেই নির্ধারিত হবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং অভিযোগের সত্যতা।